বিতর্কে সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক ও এমপি দুর্জয়

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি, দৈনিক বিবর্তন ডট কম

2
সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক ও এমপি দুর্জয়

করোনা দুর্যোগেও থেমে নেই মানিকগঞ্জ-১ (দৌলতপুর, ঘিওর ও শিবালয়) আসনের সংসদ সদস্য এ এম নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের বেপরোয়া দখল বাণিজ্য। অভিযোগের শেষ নেই তার বিরুদ্ধে। তার দখল বাণিজ্য, ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। যা এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল।

করোনা দুর্যোগে গোটা দেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও এমপি দুর্জয়ের দখল বাণিজ্য বন্ধ হচ্ছে না কোনভাবেই। এমপির চাচা তায়েবুর রহমান টিপুর নেতৃত্বে গড়ে তোলা চক্র একের পর এক জায়গা জমি দখলবাজিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এ চক্রের আগ্রাসী থাবা থেকে নদী-নালা, সরকারি খাল, টার্মিনাল, রাস্তা থেকে শুরু করে সাধারন মানুষের ভিটে বাড়ি, ফসলী জমি কোনকিছুই রক্ষা পাচ্ছে না। নির্বিঘেœ সবকিছুই গিলে খাচ্ছেন চাচা-ভাতিজার গ্রুপ। অতিসম্প্রতি চক্রটির সর্বশেষ থাবা পড়েছে আরিচা নৌ-টার্মিনালের বহুদামি সরকারি সম্পত্তিতে।

ঈদের আগে এমপি নাঈমুর রহমান দুর্জয় যখন দলবল নিয়ে যমুনার চরে ত্রাণ বিতরণে ব্যস্ত ছিলেন ঠিক তখনই তার চাচার গ্রুপ আরিচা নৌ-টার্মিনালের বহুদামী জায়গাটা পুরোপুরি জবর দখল করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান বাজার মূল্যে বিআইডব্লিউটিএ‘র বেদখল হওয়া এ জায়গার দাম অন্তত সাড়ে তিন কোটি টাকা বলে জানা গেছে। এর আগেও এমপির গণসংযোগ কিংবা জনসভাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিনব কৌশলে দৌলতপুর উপজেলা সদরে ও ঘিওর হাটের বেশ কয়েকটি জায়গা দখলবাজিরও ঘটনাও ঘটায় চক্রটি।

মানিকগঞ্জ-১ (দৌলতপুর, ঘিওর ও শিবালয়) আসনে সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক এ এম নাঈমুর রহমান দুর্জয় সরকারি দলের টিকিটে পর পর দুই বার এমপি নির্বাচিত হওয়ায় তার চাচার গ্রুপটি ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নানারকম সন্ত্রাসী কর্মকান্ড থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ পেশীশক্তির বলে এলাকা এমনকি সরকারদলীয় রাজনীতিকেও একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করে চলছে। তাদের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করারও সাহস কারো নেই।

স্থানীয় সূত্র মতে, মানিকগঞ্জ-১ আসনভুক্ত দৌলতপুর, ঘিওর ও শিবালয় উপজেলার বিভিন্ন জনপদকে রীতিমত ভীতসন্ত্রস্ত এলাকায় পরিনত করেছে চক্রটি। সেসব এলাকায় মানুষের দিন-রাত কাটে অজানা আশঙ্কায়। কখন বুঝিবা টিপু বাহিনীর সন্ত্রাসীরা হামলে পড়ে, কার না কার বাড়িঘর, ফসলি জমি, দোকানপাট জবর দখল করে তার ইয়োত্তা নেই।

জানা গেছে, গত এক বছরে দৌলতপুর উপজেলা সদর বাজারে সরকারি খালসহ জায়গা, নিরীহ লোকজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করে বড় বড় আয়তনের একাধিক পাকা মার্কেট নির্মাণ করেছে সংঘবদ্ধ এই দখলবাজ চক্র। কেউ প্রতিবাদ করলেই ‘এমপির নির্দেশ আছে’ বলে সবাইকে ভাগিয়ে দেওয়া হয়। দখল করা এসব মার্কেটের দোকানপাট এককালীন মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে লিজ দেওয়ার নামেও চলছে আরেক রকম প্রতারণার বাণিজ্য।

এদিকে সরকারি খাল ভরাটের পর মার্কেট নির্মাণ করে পজিশন দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়া হলেও তা ক্রেতাদের বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এমপি দুর্জয়ের নির্দেশে সরকারি খাল ভরাট করা হয়। পরে জৈন্তা গ্রামের মো. আমিনুর রহমান, সমেতপুর গ্রামের জুলফিকার হোসেন, মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক দেলোয়ারা দোলেন, তার বোন জামাই চান্দু মিয়া, ছোট বোন স্কুলশিক্ষিকা খুদেজা বেগম, কাকা আজাদ হোসেন, আলতাফ হোসেন, শহিদুল ইসলাম শহিদ, আমোদ আলী, আবদুল হালিম, শুবোত মিয়াসহ আরো ১০-১৫ জন থেকে চাহিদামাফিক টাকাও হাতিয়ে নেওয়া হয়। দখলবাজচক্রের অন্যতম সদস্য চেয়ারম্যান মোশারফ ও ভিপি আলমগীর হোসেন আলম এসব ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা উঠিয়ে এমপির চাচা তায়েবুর রহমান টিপুর হাতে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও ক্রেতারা দোকানের পজিশন বুঝে পাচ্ছেন না, ফেরত পাচ্ছেন না জামানতের টাকাও। বরং টাকা ফেরত চাওয়ায় ভুক্তভোগীরা নানারকম হুমকি-ধমকির মুখে ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন।

এসব ব্যাপারে এমপি দুর্জয়ের ঘনিষ্ঠজন খ্যাত মোশাররফ চেয়ারম্যান ও ভিপি আলমগীর হোসেন আলম বলেন, ‘এমপি সাহেবের নির্দেশে পকেটের টাকা খরচ করে সরকারি হজামজা খালটি ভরাট করি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাল ভরাটকাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।‘ পজেশন বরাদ্দের নামে অগ্রিম কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে তারা জানান, দলের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতাকর্মি খাল ভরাটের জন্য পাঁচ থেকে ছয় লাখ করে টাকা করে অগ্রিম দিয়েছেন। প্রশাসনিক জটিলতা শেষ হলে তাদেরকে দোকানের পজিশন বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

দুর্জয় এমপিকে ঘিরে দূর্ণামের ছড়াছড়ি: জাতীয় দলের ক্রীকেট অধিনায়ক হিসেবে দেশবাসীর ভালবাসায় সিক্ত এ এম নাঈমুর রহমান দুর্জয় নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে চরম বিতর্কিত হয়ে উঠেছেন। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ঘুষ-দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির হাজারো অভিযোগ ঘিরে আছে তাকে। দুর্জয়ের নির্বাচনী এলাকা মানিকগঞ্জ-১ আসনভুক্ত দৌলতপুর, ঘিওর ও শিবালয় উপজেলা জনপদে মানুষের মুখে মুখে তার দূর্ণামের ছড়াছড়ি। পার্সেন্টেজ বাণিজ্যেরও শীর্ষে রয়েছে এমপি দুর্জয়ের নাম। স্কুলের নাইট গার্ড নিয়োগ থেকে টিআর, কাবিখা ও সোলার প্যানেল বরাদ্দের সর্বত্রই চাহিদা মাফিক টাকা গুণে দিতে হচ্ছে।

এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য নাঈমুর রহমান দুর্জয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। চাকরিপ্রার্থীরা যাকে ঘুষ দিয়েছেন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করুন।’ তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে আলাদা কর্মকর্তা আছেন। তাদের দায়িত্বটা কি? এমপি হিসেবে আমার কাছে যেসব প্রকল্প আসে সেগুলোতে গুরুত্ব ভেবে বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে কাজ হচ্ছে, না লুটপাট হচ্ছে এসব দেখার দায়িত্ব প্রকল্প কর্মকর্তাদের।’ তিনি বলেন, যেসব বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে সেগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এমপি নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের নির্বাচনী এলাকার অসংখ্য বেকার যুবক বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরির আশায় সর্বস্ব খুইয়েছেন। তারা এমপি দুর্জয়ের পেছনে যেমন মাসের পর মাস ধর্ণা দিয়েছেন, চাকর বাকরের মতো ফুট ফরমায়েশ খেটেছেন তারপরও চাকরি নিশ্চিত করতে এমপি‘র ঘনিষ্ঠদের হাতে তুলে দিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। কিন্তু শেষমেষ তাদের কারোরই ভাগ্যে চাকরি জোটেনি, ফেরত পাননি টাকাগুলোও। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষজন চড়া সুদে আনা টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়ে প্রতি মাসে সুদ গুনতে বাধ্য হচ্ছেন। এমপির বাসভবনে চাকরির প্রলোভন দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়ার প্রতারণামূলক কান্ড থেকে দলীয় নেতা কর্মিরা পর্যন্ত রেহাই পাননি।

মানিকগঞ্জের দৌলতপুরের চরকাটারী ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক। দলীয় পদবি ব্যবহার করে কোথাও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেননি। টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজির সঙ্গেও জড়িত নন তিনি। অভাবী পরিবারের সন্তান আবু বকর সিদ্দিক স্বপ্ন দেখেন ছোট একটি চাকরির। কিন্তু চাকরি তো হয়ই-নি, উল্টো স্থানীয় সংসদ সদস্য দুর্জয়ের নামে তারই ভাগ্নে আব্বাস ঘুষ বাবদ হাতিয়ে নিয়েছেন ৫ লাখ টাকা। টাকা নিলেও তার চাকরি জোটেনি। টাকাও ফেরত দেয়া হয়নি। সেই টাকার বিপরীতে গত প্রায় আড়াই বছর ধরে সুদের ঘানি টানছে তার পরিবার। তিনি বলেন, ‘টাকা ফেরত না পেয়ে আমি এমপি সাহেবের (দুর্জয়) সঙ্গে গত মঙ্গলবার (২৩ নভেম্বর) ঢাকায় তার লালমাটিয়ার বাসায় দেখা করি। একপর্যায়ে তিনি আমাকে বললেন, আরও কিছুদিন ধৈর্য ধর। আবার সার্কুলার দিলে তোর চাকরি হয়ে যাবে।’

একই উপজেলার লাউতারা গ্রামের মৃত মহির উদ্দিনের এতিম ছেলে আবদুল আজিজও এমপি চক্রের নির্মম চাকরি বাণিজ্যের শিকার হয়েছেন। স্কুলে পিয়নের চাকরি নিতে তাকেও খোয়াতে হয়েছে ১৪ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তোলা একটি গাছের বাগান এবং এনজিও থেকে নেয়া ঋণের পুরোটাই। এ প্রসঙ্গে আজিজ বলেন, ‘পিয়ন পদের জন্য ঘুষ বাবদ সব মিলিয়ে ৬ লাখ টাকা এমপির ঘনিষ্ঠ আব্বাসের কাছে পৌঁছে দেই। কিন্তু ভাগ্যে জোটেনি চাকরিটি, ফেরত পাননি টাকাও।’ উপরন্তু নানামুখি বিপদে পড়েছেন আব্দুল আজিজ। একদিকে এনজিও‘র কিস্তি বাবদ প্রতি সপ্তাহেই হাজার টাকা গুণতে হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণ বাবদ পৌঁছাতে হচ্ছে চড়া সুদ। পরিবারের সদস্যদের মুখে দু‘বেলা দু’মুঠো খাবার তুলে দেয়াটাই যার জন্য কষ্টকর, তার মাথায় চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এমপি চক্রের ঘুষের ধকল।

জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, শুধু দৌলতপুর উপজেলায়ই ১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নাইট গার্ড কাম পিয়ন পদে নিয়োগ বাণিজ্য হয়েছে। শুধু চাকরি নয়, টিআর, কাবিখা ও সোলার প্যানেল বরাদ্দে অনিয়ম-দুর্নীতির শেষ নেই। এলাকায় আছেন এমপির তিন ‘খলিফা’। যারা প্রতিটি বরাদ্দ থেকে পারসেন্টেজ আদায় করেন। দৌলতপুর উপজেলার চকমিরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, সংসদ সদস্য নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের জনপ্রিয়তাকে গিলে খাচ্ছেন তার পরিবারের সদস্যরা। তারা টাকা ছাড়া কোনো কাজ করেন না। নিয়োগ বাণিজ্য ও উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে এমপি পরিবারের পকেটে। তিনি বলেন, এমপি দুর্জয়ের চাচা তায়েবুর রহমান টিপু, চাচাতো ভাই জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহবুবুর রহমান জনি ও ছাত্রলীগ নেতা আব্বাসসহ কয়েকজনের হাতেই বন্দি এই নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন। তাদের দাপুটে প্রভাব ও স্বেচ্ছাচারিতার কাছে পুরনো আওয়ামী লীগ নেতারা কোণঠাসা হয়ে আছেন।

নির্বাচনী এলাকার তিনটি উপজেলাতেই সরকারি সব প্রকল্প থেকে অগ্রিম ১০ পার্সেন্ট কমিশন আগাম বুঝিয়ে দেয়ার পরই এমপি‘র ডিও লেটার পাওয়া সম্ভব হয়েছে। সম্প্রতি দৌলতপুর উপজেলার চন্দ্রখোলা বিল খনন কাজের ৪০ লাখ টাকার প্রকল্প কাজের জন্যও তিনি আগাম ৪ লাখ টাকা আদায় করে নেন। চকমিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২০ লাখ টাকা বরাদ্দের পুরোটাই আত্মসাৎ করার অভিযোগও উঠেছে এমপি দুর্জয়ের বিরুদ্ধে। এছাড়াও সমেতপুর পূর্ব ও পশ্চিম রাস্তা সংস্করণে টিআর কাবিখা প্রকল্পের মোট ৮ লাখ টাকার কাজ না করেই আত্মসাৎ করেন উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল কুদ্দুস ও এমপির পিএস আনোয়ার। বাঁচামারা নদীরক্ষায় জিও ব্যাগ বাবদ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরাদ্দের ১ কোটি টাকার পুরোটাই এমপির তত্বাবধানে আত্মসাৎ করার ঘটনা ঘটেছে। দৌলতপুর মতিলাল ডিগ্রি কলেজকে সরকারি করণ বাবদ ১০ লাখ টাকা, পিএস উচ্চ বিদ্যালয় সরকারিকরণ বাবদ ১৫ লাখ টাকা নেন এমপি। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শতাধিক পদে লোক নিয়োগের নামে এমপি চক্রের বিরুদ্ধে খোলামেলা ঘুষ বাণিজ্য চালানোর গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।